প্রকাশিত : ১৮:২৯
৩১ জানুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যেমন রয়েছে প্রবল উত্তেজনা, তেমনই বিরাজ করছে এক ধরনের গভীর অনিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, মাসের প্রথম কার্যদিবসে বাজারের গতিপ্রকৃতি কেমন হতে পারে, তা বুঝতে হলে আমাদের বিগত কয়েক সপ্তাহের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক এবং করপোরেট আয়ের গতিধারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। গত ২৯ জানুয়ারি, সপ্তাহের শেষ লেনদেনের দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) ২০.০৯ পয়েন্ট বা ০.৩৯ শতাংশ কমে ৫,১৫৪.৩১ পয়েন্টে থিতু হয়েছে। টানা তিন কার্যদিবসের এই দরপতন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিনিয়োগকারীরা এখন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন এবং নির্বাচনের আগে বড় ধরনের কোনো ঝুঁকি নিতে দ্বিধা বোধ করছেন। তবে এই সাধারণ চিত্রের ভেতরেও নির্দিষ্ট কিছু খাতের শেয়ারে আগামী দিনে বিশেষ ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক তার কঠোর বা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। বর্তমানে নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০.০০ শতাংশে অবস্থান করছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। যদিও মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি বর্তমানে ৮.৯ শতাংশের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা সরাসরি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় এবং বাজারে তারল্য প্রবাহকে প্রভাবিত করছে। উচ্চ সুদের হারের এই পরিবেশে ব্যাংকিং আমানত বা বন্ড মার্কেট অনেক সময় পুঁজিবাজারের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা ইক্যুইটি মার্কেটের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। তবে আইএমএফ (IMF)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ হতে পারে, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা আশাব্যঞ্জক এবং দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করে।
ওষুধ ও রসায়ন খাতের অভাবনীয় উত্থান এবং ১ ফেব্রুয়ারির সম্ভাবনা
ওষুধ ও রসায়ন খাত বর্তমানে ডিএসইর সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল খাতের একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান রেনাটা পিএলসি সম্প্রতি এক অনন্য সাফল্য অর্জন করেছে। যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বাজার থেকে তারা তাদের এসোমিপ্রাজল ২০ মিলিগ্রাম ও ৪০ মিলিগ্রাম গ্যাস্ট্রো-রেসিস্ট্যান্ট ট্যাবলেটের জন্য মার্কেটিং অথোরাইজেশন বা বিপণনের অনুমতি পেয়েছে। এই খবরটি কেবল রেনাটার জন্য নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, রেনাটা জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে মুনাফায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২৯ জানুয়ারি রেনাটার শেয়ার মূল্য ৪১৪.৮০ টাকায় লেনদেন শেষ করেছে এবং কারিগরি নির্দেশক অনুযায়ী এটি বর্তমানে 'স্ট্রং বাই' সংকেত দিচ্ছে। যুক্তরাজ্যের এই নতুন বাজার থেকে আয়ের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা ১ ফেব্রুয়ারি রেনাটার শেয়ার দর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা যায়।
একই খাতের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসও বিনিয়োগকারীদের চমকে দিয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (H1) কোম্পানিটি তাদের মুনাফায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। উচ্চ বিক্রয় এবং উন্নত মার্জিন এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে। সাধারণত পুঁজিবাজারে যখন কোনো খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলো ভালো ফলাফল করে, তখন সেই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। ১ ফেব্রুয়ারি নাভানা ফার্মার প্রতি বিনিয়োগকারীদের বিশেষ আকর্ষণ থাকতে পারে। অন্যদিকে, টেকনো ড্রাগস লিমিটেড তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য ৩১ জানুয়ারি বোর্ড সভা আহ্বান করেছে। প্রথম প্রান্তিকে তাদের শেয়ার প্রতি আয় (EPS) ছিল ০.৪৭ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। সরকারি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং আইপিওর মাধ্যমে শেয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মুনাফায় এই নিম্নমুখী চাপ দেখা দিয়েছিল। তবে রবিবারের বাজারে টেকনো ড্রাগসের শেয়ারের গতিবিধি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে তাদের সদ্য প্রকাশিতব্য অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যের ওপর। যদি কোম্পানিটি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আয় দেখাতে পারে, তবে এটি খাতের সামগ্রিক গতিশীলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন ও অস্থিরতা
ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFI) খাত বর্তমানে এক বিশাল সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নয়টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর বা 'নন-ভায়েবল' ঘোষণা করে তাদের অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে ফাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অবসায়নের খবরের পরেও ফটকা কারবারিদের প্রভাবে কিছু দুর্বল এনবিএফআই-এর শেয়ার দর গত সপ্তাহে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন যে, 'ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫' এর আওতায় আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদান করা হবে, তবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি রবিবারের বাজারে এই খাতের শেয়ারগুলোতে ফটকা লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মৌলিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট একটি বড় চিন্তার বিষয়। ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (ICB) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৩১১ কোটি টাকা বিশাল অংকের লোকসান দিয়েছে, যার মূল কারণ ছিল সুদ আয় কমে যাওয়া এবং পুঁজিবাজারের অস্থিরতার কারণে ক্যাপিটাল গেইন করতে না পারা। আইসিবির এই দুর্বল অবস্থান পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। তবে ব্র্যাক ব্যাংকের মতো মৌলভিত্তি সম্পন্ন ব্যাংকগুলোর প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী আগ্রহ বজায় রয়েছে, কারণ ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি 'বিকাশ' (bKash) ভবিষ্যতে একটি বিশাল ভ্যালু আনলকিংয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সুদের হার বাজারভিত্তিক হওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর সুদ আয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ (NPL) এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট মুনাফাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। রবিবারের বাজারে ভালো মৌলভিত্তির ব্যাংকের শেয়ারগুলোতে স্থিতিশীলতা দেখা যেতে পারে, তবে বড় উত্থানের সম্ভাবনা কম।
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাত: এসিআই এবং আমল-প্রাণের বিপরীতমুখী যাত্রা
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে এসিআই লিমিটেড বর্তমানে একটি বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিটি তাদের রিটেইল চেইন 'স্বপ্ন'র (Swapno) ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং সাপ্লাই চেইন উন্নয়নের জন্য ৬৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। একই সাথে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ইনস্টিটিউট স্থাপনে ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে এসিআই-এর রাজস্ব ১৮ শতাংশ বেড়ে ৭,৭৯৪ কোটি টাকায় পৌঁছালেও বিপুল পরিমাণ ঋণের সুদ ব্যয় তাদের নিট মুনাফাকে চাপের মুখে রাখছে। ১ ফেব্রুয়ারি এসিআই-এর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে, যেখানে রাজস্ব বৃদ্ধি ইতিবাচক কিন্তু উচ্চ ব্যয় নেতিবাচক দিক হিসেবে কাজ করবে।
বিপরীত দিকে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড (AMCL-Pran) তাদের অর্ধবার্ষিক মুনাফায় ১২ শতাংশ পতন রেকর্ড করেছে। কোম্পানিটির রাজস্ব কমে ১৫৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং শেয়ার প্রতি আয় (EPS) ৩.৮৭ টাকা থেকে কমে ৩.৩৯ টাকায় নেমেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিক্রির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, যার প্রভাব আমল-প্রাণের আয়ে স্পষ্ট। কোম্পানিটি ৩১ জানুয়ারি বোর্ড সভা আহ্বান করেছে এবং রবিবারের বাজারে এই সভার ফলাফল তাদের শেয়ার দরের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। সাধারণত উচ্চ পি/ই (P/E) রেশিও সম্পন্ন এই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা এখন কিছুটা সতর্ক থাকতে পারেন।
প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও সিমেন্ট খাতের চ্যালেঞ্জ ও লোকসানের কারণ
প্রকৌশল এবং উৎপাদনমুখী শিল্প খাত বর্তমানে ডলার সংকট এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জিপিএইচ ইস্পাত (GPH Ispat) প্রথমার্ধে তাদের মুনাফায় ৮৬ শতাংশ ধসের খবর দিয়েছে। নির্মাণ খাতে ধীরগতি এবং বড় বড় প্রকল্পের কাজ কমে যাওয়ায় ইস্পাতের চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া রানার অটোমোবাইলস তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১.৪১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে, কারণ তাদের মূল ব্যবসা অর্থাৎ চার চাকার গাড়ির বিক্রি কমে গেছে। যদিও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রানার মোটরস ৪২ শতাংশ বিক্রয় বৃদ্ধি করেছে, কিন্তু সামগ্রিক লোকসান কোম্পানিটিকে চাপে রেখেছে। ১ ফেব্রুয়ারি রবিবারের বাজারে এই খাতের শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগকারীদের কোনো বড় আগ্রহ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সামিট পাওয়ারের রাজস্ব প্রথমার্ধে ৩০ শতাংশ কমে ১,৭০৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডলার সংকটের কারণে ফার্নেস অয়েল আমদানি এবং সরকারি বকেয়া সময়মতো না পাওয়া এই খাতের মুনাফাকে কমিয়ে দিচ্ছে। যমুনা অয়েল কোম্পানিও তাদের সুদ আয় কমে যাওয়ায় মুনাফা হ্রাসের তথ্য প্রকাশ করেছে। যমুনা অয়েলের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো, তারা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রাখা তাদের বিশাল আমানতের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুদ পাচ্ছে না, যা তাদের সামগ্রিক আয়ে প্রভাব ফেলছে। সিমেন্ট খাতের ক্রাউন সিমেন্ট এবং প্রিমিয়ার সিমেন্টের রাজস্ব বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় এবং অর্থায়ন খরচ বৃদ্ধির কারণে তাদের নিট মুনাফা কমেছে। রবিবারের বাজারে এই খাতের শেয়ারগুলোতেও ধীরগতি লক্ষ্য করা যেতে পারে।
কাগজ ও মুদ্রণ খাত: বসুন্ধরা পেপার মিলসের বিপর্যয় ও 'Z' ক্যাটাগরির প্রভাব
কাগজ ও মুদ্রণ খাতে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড (BPML)। কোম্পানিটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১০১ কোটি টাকা বিশাল অংকের লোকসান দিয়েছে। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে কোম্পানিটি জানিয়েছে যে, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং ব্যাংক ঋণের সুদ ব্যয় ১০৮ শতাংশ বেড়ে ১৫৫.৯২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং এলসি খুলতে না পারার কারণে কাঁচামালের তীব্র সংকটে তাদের রাজস্ব ৪০ শতাংশ কমে গেছে। কোম্পানিটিকে ইতিমধ্যে 'A' ক্যাটাগরি থেকে 'Z' ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এই শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঋণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। ২৯ জানুয়ারি এই শেয়ারটির দর ছিল ২৩.৮০ টাকা, যা ৫২ সপ্তাহের সর্বনিম্ন দরের কাছাকাছি। রবিবারের বাজারে এই শেয়ারটির ওপর ব্যাপক বিক্রয় চাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এটি নিয়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আইটি ও সেবা খাত: একমাত্র সফলতার গল্প
পুঁজিবাজারের বর্তমান অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে আইটি ও সেবা খাত কিছুটা ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (BSCCL) প্রথমার্ধে ৫৯ শতাংশ বিশাল মুনাফা প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তাদের রাজস্ব ২৯ শতাংশ বেড়ে ২৫১.৫৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আইপি ট্রানজিট এবং আইপিএলসি ভাড়ার চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার ফলে কোম্পানিটি এই সাফল্য পেয়েছে। এছাড়া সরকারি নীতিগত সহায়তাও তাদের অনুকূলে রয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ডেটা চাহিদাই এই খাতের মূল প্রাণশক্তি। ১ ফেব্রুয়ারি রবিবারের বাজারে আইটি খাতের শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ ঝোঁক থাকতে পারে এবং সাবমেরিন কেবলের শেয়ারে বড় ধরনের লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দান বর্তমানে উত্তপ্ত। বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে বলে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন পূর্ববর্তী সহিংসতা, ব্লকেড এবং দলীয় কোন্দলের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে যে শঙ্কা দানা বেঁধেছে, তা বাজারের লেনদেনের পরিমাণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। ফিচ সলিউশনস (Fitch Solutions) তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, নির্বাচনের পরেও রাজনৈতিক অস্থিরতা বজায় থাকার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতের সাথে সম্পর্কের শীতলতা এবং চীন ও পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের চিরাচরিত কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী এবং বাজার, ফলে এই সম্পর্কে কোনো ধরনের অবনতি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। নির্বাচনের আগে ১ ফেব্রুয়ারি বাজারে এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা বড় বিনিয়োগ না করে নগদ টাকা হাতে রাখাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন।
কারিগরি বিশ্লেষণ এবং রবিবারের বাজারের জন্য বিশেষ গাইডলাইন
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) বর্তমানে ৫,১৫০ পয়েন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট বা সমর্থন জোনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২৯ জানুয়ারি বাজার ৫,১৭৪ পয়েন্টে শুরু হয়ে দিন শেষে ৫,১৫৪ পয়েন্টে নেমে আসে, যা একটি বিয়ারিশ ক্যান্ডেলস্টিক প্যাটার্ন তৈরি করেছে। সূচক যদি ৫,১৫০ পয়েন্টের নিচে নেমে যায়, তবে পরবর্তী বড় সাপোর্ট হতে পারে ৫,১০০ পয়েন্টে। আর যদি ৫,২০০ পয়েন্টের বাধা অতিক্রম করতে পারে, তবেই বাজারে নতুন করে প্রাণ ফিরবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে বাজারের পি/ই (P/E) রেশিও ৮.৬ এ নেমে এসেছে, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নগুলোর একটি। এর মানে হলো, মৌলিকভাবে অনেক ভালো শেয়ার এখন অত্যন্ত সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্রেতারা এগিয়ে আসছেন না।
রবিবার ১ ফেব্রুয়ারির জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সম্ভাবনা:
প্রথমত, ওষুধ খাতের শেয়ারগুলোতে বিশেষ করে রেনাটা এবং নাভানা ফার্মায় ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যের নতুন বাজার রেনাটার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী আয়ের উৎস হবে, যা ১ ফেব্রুয়ারির বাজারে শেয়ারটির দর বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
দ্বিতীয়ত, আইটি খাতে সাবমেরিন কেবলের অভাবনীয় মুনাফা প্রবৃদ্ধির কারণে এই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে আইসিবির বিশাল লোকসানের খবর সামগ্রিক বাজারে এক ধরনের হতাশা ছড়াতে পারে, যা বড় মূলধনী ব্যাংকের শেয়ারগুলোকে চাপে রাখবে।
চতুর্থত, কাগজ ও মুদ্রণ খাতে বসুন্ধরা পেপার মিলসের বিপর্যয় এই খাতের অন্যান্য ছোট শেয়ারগুলোকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
পঞ্চমত, সাধারণ বীমা খাতে গত কয়েকদিন ধরে ভালো লেনদেন হচ্ছে এবং ১ ফেব্রুয়ারি রবিবারেও এই ধারা বজায় থাকতে পারে।
সার্বিকভাবে, ১ ফেব্রুয়ারি রবিবারের পুঁজিবাজার হবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। নির্বাচনের ঠিক ১১ দিন আগে বাজারের এই অবস্থা ইঙ্গিত দেয় যে, বড় বিনিয়োগকারীরা এখন 'অপেক্ষা করো এবং দেখো' (Wait and Watch) নীতি অনুসরণ করছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি স্বচ্ছ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অন্তর্ভুক্তি বা বর্জন নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা বাজারের জন্য অস্বস্তিকর। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ থাকবে, কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের কথা চিন্তা করা। ১ ফেব্রুয়ারির বাজারে কোনো বিশেষ খাতের জাদুকরী উত্থানের চেয়ে সূচকের স্থিতিশীলতা বজায় থাকাই হবে বাজারের জন্য বড় অর্জন। অর্থনৈতিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বড় কোনো বুলিশ ট্রেন্ডের প্রত্যাশা করা কঠিন। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নগদ অর্থের মজুদ বজায় রাখা এবং কেবল অত্যন্ত সস্তা হয়ে পড়া নীলচিপ (Blue-chip) শেয়ারগুলোতে নজর দেওয়া হবে এই সময়ের সেরা কৌশল। বাজারের এই ক্লান্তিকাল শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (Rebound) সুযোগ তৈরি করবে, তবে তার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। ১ ফেব্রুয়ারির লেনদেন হবে ফেব্রুয়ারির বাকি দিনগুলোর বাজারের জন্য একটি দিকনির্দেশক, যেখানে বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক শক্তির কঠোর পরীক্ষা হবে।