প্রকাশিত :  ০৫:৩৯
৩০ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:৪২
৩০ জানুয়ারী ২০২৬

নীরবতার আড়ালে এক বহুমাত্রিক সাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

নীরবতার আড়ালে এক বহুমাত্রিক সাহিত্যিক রেজুয়ান আহম্মেদ

✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু নাম রয়েছেন, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চান না, অথচ তাঁদের সৃষ্টিকর্মই তাঁদের পরিচয় বহন করে। রেজুয়ান আহমেদ তেমনই এক নাম—যিনি নীরবে কাজ করে যেতে পছন্দ করেন এবং আত্মপ্রচারের আলো থেকে সচেতনভাবেই নিজেকে দূরে রাখেন।

তিনি কখনোই নিজেকে ‘লেখক’ বা ‘সাহিত্যিক’ হিসাবে তুলে ধরতে আগ্রহী নন। বরং তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস—লেখাই যেন নিজের কথা বলে। কিন্তু তাঁর লেখার বিস্তৃতি, বিষয়বৈচিত্র্য ও গভীরতা এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যে, এই নীরবতা আর তাঁকে আড়াল করে রাখতে পারছে না।

রেজুয়ান আহমেদ একাধারে সাহিত্যিক, কবি, গীতিকার, কলামিস্ট, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এবং একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই তাঁর সাবলীল বিচরণ লক্ষণীয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর কাজ এক অনন্য মাত্রা সংযোজন করেছে।

তাঁর রচনাসমূহের দিকে তাকালেই বিষয়বস্তুর গভীরতা স্পষ্ট হয়। ‘এক মুঠো গল্প’, ‘মায়াবী মুহূর্ত’, ‘শঙ্খের শপথ’, ‘আলোকছায়া’, ‘সন্দেহের ছায়া’, ‘অদৃশ্য কান্না’ কিংবা ‘শব্দে তুমি’—এই বইগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক সংকট একাকার হয়ে আছে। অন্যদিকে ‘সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে’ কিংবা ‘স্বপ্নের চাকরি’–র মতো রচনায় পেশাগত জীবনের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে সংবেদনশীল ভাষায়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রচিত কাজগুলো। ‘গাজার দিনগুলো’, ‘The Day of Gaza’, ‘অ-জল নির্বাসন’—এই রচনাগুলো কেবল সাহিত্য নয়, বরং সময়ের দলিল। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয়ের ভেতর মানুষের অনুভূতিকে তিনি তুলে এনেছেন নির্মোহ অথচ গভীর সহমর্মিতার সঙ্গে। একইভাবে ‘বন পাখির প্রেম’ এবং ‘Love of the Forest Bird’–এ প্রকৃতি, প্রেম ও স্বাধীনতার প্রতীকী রূপ পাঠককে এক ভিন্ন অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়।

তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অহংকারহীনতা। ভাষা কখনো ভারী হয়ে ওঠে না, আবার অস্বাভাবিক হালকাও নয়। ভাবনার গভীরতা পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়, কিন্তু কোনো মতামত চাপিয়ে দেয় না। এই নিরহংকার মনোভাবই তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে।

ব্যক্তিজীবনে রেজুয়ান আহমেদ প্রচারবিমুখ। নিজেকে আড়ালে রাখতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবু তাঁর লেখা নিয়মিত পাঠকের কাছে পৌঁছয়—নীরবে, নির্ভরযোগ্যভাবে। সম্ভবত এখানেই তাঁর শক্তি নিহিত—তিনি নিজেকে নয়, তাঁর ভাবনাকেই প্রধান্য দেন।

বর্তমান সময়ে যখন লেখালেখিও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, তখন রেজুয়ান আহমেদের মতো একজন স্রষ্টা আমাদের মনে করিয়ে দেন—সাহিত্য আসলে আত্মপ্রকাশের নয়, আত্মউন্মোচনের মাধ্যম। তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাই পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রাখে।

নীরবতার আড়ালে থাকা এই বহুমাত্রিক লেখকের সাহিত্যযাত্রা এখনো চলমান। আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও যিনি আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন—রেজুয়ান আহমেদ নিঃসন্দেহে সমসাময়িক সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী উপস্থিতি।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর