প্রকাশিত : ১৯:৩০
২৯ জানুয়ারী ২০২৬
✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ উন্নয়নের গল্প বলতে ভালোবাসে। প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, মেগাপ্রকল্প—সবই আমাদের দৃশ্যপটে উজ্জ্বল। কিন্তু যে শ্রমশক্তি এই উন্নয়নের মূল কারিগর, তাদের 'দৃশ্যমানতা' আজও প্রশ্নের মুখে।
দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। তারা জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৪৩ শতাংশ অবদান রাখলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, ডিজিটাল কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার বলয় থেকে এখনো অনেক দূরে। অধিকাংশ শ্রমিকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নেই, নেই কাজের ইতিহাসের স্বীকৃত কোনো নথি। এর ফলে শ্রমিকরা যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তেমনি নিয়োগকর্তারাও দক্ষ জনবল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—ডিজিটাল বাংলাদেশ কি কেবল অবকাঠামো আর নাগরিক সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
সরদারি ব্যবস্থার খেসারত
বাংলাদেশের নির্মাণ ও শিল্পখাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো অনেকাংশে মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘সরদারি’ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক সমাধান দিলেও এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে অস্বচ্ছতা ও শোষণ।
এখানে দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে একজন দক্ষ শ্রমিক প্রায়ই ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন, আর নিয়োগকর্তাও কাজের মান নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেন না। দীর্ঘমেয়াদে এই অনানুষ্ঠানিকতার খেসারত দিতে হয় পুরো অর্থনীতিকে।
প্রযুক্তি কি সমাধান দিতে পারে?
এই প্রেক্ষাপটে Kormi24.com-এর মতো ডিজিটাল উদ্যোগগুলো শ্রমবাজারকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। এটি কেবল প্রচলিত কোনো চাকরির বিজ্ঞাপনের সাইট নয়; বরং যাচাইকৃত পরিচয়, অবস্থানভিত্তিক তথ্য ও রেটিংনির্ভর একটি ‘স্কিল মার্কেটপ্লেস’।
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) যাচাই, কাজের ইতিহাস সংরক্ষণ ও দ্বিমুখী রেটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন শ্রমিক এখানে একটি দৃশ্যমান ডিজিটাল পরিচয় পাচ্ছেন। নিয়োগকর্তার জন্য এটি যেমন আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, শ্রমিকের জন্যও তৈরি করে ন্যায্য দরকষাকষির সুযোগ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই প্ল্যাটফর্মটি শ্রমিকের মজুরি থেকে কোনো কমিশন নেয় না। এটি একটি বলিষ্ঠ নীতিগত অবস্থান, যা একে প্রচলিত ‘গিগ ইকোনমি’ মডেল থেকে আলাদা ও মানবিক করে তুলেছে।
বাজার বড়, কিন্তু কাঠামো দুর্বল
বাংলাদেশের নির্মাণ খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে এই খাতের বাজারমূল্য ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, অনলাইন গিগ ইকোনমিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শ্রম সরবরাহকারী দেশ।
এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও নির্মাণ শ্রমিকদের বড় অংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা দক্ষতার স্বীকৃত ডেটাবেজ নেই। ফলে একটি বিশাল শ্রমবাজার কার্যত তথ্যহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে—যেখানে দক্ষতা থাকলেও তার প্রমাণ নেই এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কোনো মজবুত ভিত্তি নেই। এই শূন্যস্থান পূরণে ডিজিটাল স্টাফিং প্ল্যাটফর্মগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এটি কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিরও বিষয়।
রাষ্ট্রের করণীয়
ডিজিটাল শ্রমবাজারের সুফল কেবল উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রমিকের কাজের ইতিহাস, আয় ও রেটিং ভবিষ্যতে তাদের ঋণপ্রাপ্তি, বীমা সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষার মানদণ্ড হতে পারে।
এজন্য প্রয়োজন নীতিগত স্বীকৃতি। ডিজিটাল শ্রম প্ল্যাটফর্মগুলোকে শ্রম আইন ও জাতীয় নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, দক্ষতার প্রত্যয়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির (Financial Inclusion) সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সংযোগ ঘটাতে না পারলে প্রযুক্তির প্রকৃত সুফল সাধারণ শ্রমিকের কাছে পৌঁছাবে না।
ডিজিটাল বাংলাদেশ যদি কেবল অ্যাপ ও অবকাঠামোর গল্পে আটকে থাকে, তবে উন্নয়নের একটি বিশাল অংশ অদৃশ্যই থেকে যাবে। শ্রমিকের পরিচয়, দক্ষতা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা অনেকটা বিভ্রমের মতো।
Kormi24-এর মতো উদ্যোগগুলো পথ দেখাচ্ছে যে, শ্রমবাজারকে সুশৃঙ্খল ও ডিজিটাল করা সম্ভব। এখন প্রশ্ন একটাই: রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকেরা কি এই পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক হবে।