শরৎ ব্রিটেনের দ্বারপ্রান্তে, ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি আবার বজ্র গম্ভীর মেঘের কানফাঁটানো আর্তনাদ । বেলা শেষে, মনভোলানো কাঁশফুলের স্নিগ্ধ সুবাস , শিশির ভেজা দুর্বা ঘাসে আলতো পা ফেলা আর শ্বেত শুভ্র মেঘের ভেলা ভাসানো স্বচ্ছ নীল আকাশ , ভীষণ মন ভাল করার ক্ষণ। তবে, কিনা দুবোর্ধ্য মানব মন যেমন ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়, রহস্যময় প্রকৃতি ও তার রুপ বদলাতে ভালবাসে, ভালবাসে বৈচিত্র্য আর অনিশ্চয়তা কে সাথি করতে। স্বচ্ছ আকাশে উড়ন্ত গ্রেট ব্রিটেনের রাজসিক সিংহ খচিত পতাকাটি কি এক অনিশ্চয়তার কালো মেঘে আজ ঢাকা পড়েছে। এই তো সেদিন, সেন্ট্রাল লন্ডন গাজামুখী পদচারণায় মুখরিত , পট পরিবর্তন অভিবাসী বিক্ষোভে বিক্ষুদ্ধ ব্রিটিশবাসী,টমি রবিনসন নামের এক ভূঁইফোঁড়ের পশ্চিমা মদদে তীব্র আস্ফালন আর বর্তমান বিরোধী টোরি দলের মধ্যপ্রাচ্য সংকট কে ঘৃণিত কার্নিভাল নামে আখ্যায়িত করা- কি বোঝা যায় ? অপরিনত শিশুর মনের অতল পাওয়া যেমন দু:সাধ্য, উঠতি কৈশোরের স্বপ্নালু চোখ যেমন ঘুরন্ত লাঠিমের ভেতর তার স্বপ্নের পৃথিবীকে খুঁজে, দু:সাহসী যৌবন সুসজ্জিত মঞ্চে হাজার ও করতালির শব্দ শুনতে ইচ্ছুক ঠিক তেমনি পড়ন্ত বেলার অভিজ্ঞ প্রবীণ তার শিয়রে প্রিয়জনদের মায়ায় ভরা কোমল স্পর্শের আকুল অপেক্ষায় থাকে। কালবেলার নানা প্রান্তে দাঁড়ানো , মন-মননের দ্বিমুখী মানুষগুলো আজ ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে বিভক্ত , বিক্ষুদ্ধ । কখনো বা ধর্মীয় উন্মাদনা, কখনোবা জাতিগত বিদ্বেষ , বাস্তু সংকট গোঁদের উপর বিষফোঁড়া অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় যাযাবরের জীবন বেঁছে নেওয়া , জীবন সমাপ্তি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ অথবা টানাপোড়েনের এক নিদারুণ বাস্তবতা । কোথায় যেন মানবতা নামক সে সুন্দর অথচ দারুন অর্থবহ শব্দটির গভীর প্রভাবটি ক্রমশ পৃথিবী হতে হারিয়ে যেতে বসেছে।
সরকারি দল বহু প্রতীক্ষিত লেবার, অপেক্ষার ক্লান্তিকর প্রহর নেতা নামক সে ইস্পাত দৃঢ় ব্যক্তিত্ব আজ বহু বছর ধরেই অনাবাসীদের প্রাণ ভোমরা বলে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী দলটিতে অনুপস্থিত। ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের দেশীয় আবেগ আজ অনেকখানি হতাশায় ম্রিয়মান , বাঙালি স্বর্ণকন্যাগণ একের পর এক রাজনৈতিক অঘটনের জন্ম দিয়ে চলেছেন- বংশ পরিক্রমায় দ্বীপ্ত টিউলিপ সিদ্দিক, অপরাজিত রুশনারা আলি, সংগ্রামি আফসানা বেগম কিংবা ব্রিটিশ ইতিহাসের প্রথম নারী চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস ব্রিটিশ গণমাধ্যমের চুলচেরা বিশ্লেষণে তারা কর্মদক্ষতায় দাঁড়িপাল্লার সমানতালে অবস্থান করছেন । সর্বজনস্বীকৃত ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক অবস্থার গর্বিত পদচারণার নিদারুণ দুর্বলতা আজ জনসম্মুখে প্রকট। মার্কস এন্ড স্পেনসারের ভাঁজহীন শার্টের কলারে অযত্নে বোনা ছোট্ট ছিদ্র চোখে পড়ে বৈকি !
সাবেকি ধাঁচের ইংরেজ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, পোশাকি ভাষায় কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক কিংবা রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিখাদ সেল্ফ মেইড ম্যান। এই ঘাঁমে ভেজা শরীর ও পোঁড় খাওয়া ব্যক্তিটি যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দৌড়ে এবং দূরদর্শিতায় বেশ কিছুটা পিছিয়ে আছেন সমসাময়িক বিশ্ব নেতাদের তুলনায় চলমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলোতে সুস্পষ্ট । কিছুটা সাহস, কিছুটা আপোসকামিতা আর বেশ খানিকটা দ্বিধাবিভক্তি সম্প্রতি শেষ হওয়া কাউন্সিলর ইলেকশনে লেবারের উপর আমজনতার অনাস্থা পরিস্কার ভাবে ফুঁটে উঠেছে । ক্ষমতার মসনদ, সুদূরপ্রসারি নারী নেতৃত্ব, ইতিবাচকতার আভাস অল্প সময়ে লেবারের কার্যকারিতা প্রশ্নের সম্মুখীন । বিস্ময়করভাবে , চিরপ্রতিদন্বী টোরি নয় শ্রেণিকক্ষের পিঁছিয়ে থাকা কূটবুদ্ধির ছাত্রটি আজ ব্রিটিশ রাজনীতি তথা বিশ্ব রাজনীতিতে ছক্কা হাঁকানোর অপেক্ষায় । সাদা সাপ ,বর্ণচোরা কিংবা দ্বৈত ব্যক্তিসত্তা ( সেই চিরসবুজ ড: জেকিল অথবা মি: হাইড ) যেই নামেই ডাকা হোক না নাইজেল ফারাজে কে বোঝা আমজনতার অসাধ্য ! কে হায় সাধে দু:খ ডাকিয়া আনিতে চায়!
রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পূর্ণ ভিন্ন , আশৈশব বেড়ে উঠা খুব সম্ভবত মেধার বিকাশ কিংবা প্রতিভার স্ফুরণ এসবকিছুতেই বরিস যোজন যোজন মাইল এগিয়ে । তবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জনসন আর সময়ের আলোচিত রাজনীতিবিদ নাইজেল একটি বিষয়ে এক এবং বাকি সবার থেকে আলাদা । অদ্ভুতুড়ে চরিত্র , বিশ্বজনতার বরিসকে রীতিমত পাগলাটে খেতাব উপহার দেওয়া কিন্তু, সাবেক অর্থমন্ত্রী রিশির সহায়তায় মহামারীর ক্রান্তিকালকে সাফল্যমন্ডিত করে বিশ্ব ইতিহাস রচনা করলেন নতুনভাবে। সময় গড়াল, সহযোগী হলেন প্রতিপ্রক্ষ তবে, সাংবাদিক বরিস রচিত ‘আনলিশ্ড ‘ বইটি ঝলমলে জীবনের আড়ালে এক আবেগমথিত স্বপ্নবাজ মানুষের শেকড়ের গল্পই বলে যায় । কিয়ার স্টারমার, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রীটের বর্তমান বাসিন্দা , শীর্ষে পৌঁছানোর গল্পটি একেবারেই শূন্য হতে শুরু কোথায় যেন জনসাধারণের সাথে হৃদয়ের সুরটি ঠিক মিলছে না । টানা প্রায় ১৫টি বছর, আমজনতা টোরি বিমুখ- লিবডেম, এনসিপি ,গ্রীন পাটির্ বিপরীত সারির দলগুলোর রাজনৈতিক শক্তি ক্রমশ উর্ধমুখী আর এই বিপরীতমুখী ডামাডোলের সুযোগে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নানা ঘটন-অঘটনের জন্ম দিয়ে ও বিতর্কিত নাইজেল নিজ দল ‘রিফর্মের ‘ জনপ্রিয়তা কে ক্রমশ উর্ধমুখী করে তোলার পাশাপাশি ব্রিটেনের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর নাটকীয় দৌড়ে নিজেকে অন্যতম গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে সাধারণ ব্রিটিশদের কাছে তুলে ধরতে সর্মথ হয়েছেন।
বোদ্ধাদের মত, বর্তমান যদি ভবিষ্যত রচনার ভিক্তি হয় তবে, আধুনিক ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে হয়তবা, ফারাজে সর্ব্বোচ ভূমিকম্প টির জন্ম দিতে সার্থক হবেন ! ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট যে নতুন অতিথির আগমনের অপেক্ষায় ব্যাকুল !
প্রথমা‘র শক্তি হয়তবা সময়ের সাথে সাথে বাড়তে পারে নতুবা প্রকৃতির নিয়মেই ক্ষয়ে যায়, রেখে যায় ঝরা পাতার স্মৃতিচিহ্ন। তবে, বাড়ির বড় ছেলে যে বড় ছেলেই-আদর, আবদার আর দায়িত্ব এ স্নেহকাতর ঝুলিটির ভার যে তার কাঁধেই বেশি শোভা পায় । তবে, ধূসর চুলের প্রবীণ হতে জেন জি ব্রিটিশ তাদের সেই সযত্নে সজ্জিত ঐতিহ্যের প্রতি দিন দিন বিমুখ হয়ে পড়ছে, আর এখানেই ‘রিফর্মের ‘ বাজিমাত , ১ম রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ কে অত্যন্ত কার্যকর ভাবে ই অন্যতম বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতির মাঠে প্রতিস্থাপনে সক্ষম হয়েছে ডানপন্থী দলটি ।
সদ্য শেষ হওয়া গ্রীষ্ম , রোদের উষ্ম তাপের মতই ফারাজের দল ‘রিফর্ম ‘ স্থানীয় কাউন্সিলর নির্বাচনে সাড়া জাগানো বিজয় অর্জন করতে সর্মথ হয়েছে । বিগত এপ্রিলের স্থানীয় নির্বাচন ‘২৫ ফারাজের দলের ধারাবাহিকতাকেই প্রমাণ করে।
বাতাসে অনুচ্চ ফিসফিস, অযুত নয় নিযুত নয় লক্ষ হৃদয়ের প্রশ্ন- স্থানীয় নির্বাচন কি আদৌ জাতীয় নির্বাচনকে প্রতিফলিত করে ? বহুল আলোচিত এম.আর.পি.( মাল্টি লেভেল রিগ্রেশন এন্ড পোস্ট -স্ট্রাটিফিকেশন ) মডেলটি রাজনীতির জটিল অলিগলি বুঝতে বেশ খানিকটা সর্মথ । বিগত , সেপ্টেমবর‘২৫ সালে ‘যুগভ‘ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী , বর্তমানে ‘রিফর্ম‘ শতকরা ৩০ ভাগ জনসমর্থন পুষ্ট, অপরপক্ষে ক্ষমতাসীন দল লেবার শতকরা ২০ ভাগ জনমুখি সরকার।
জনমত জরিপ অনুযায়ী , এ মূহুর্তে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ‘রিফমর্ ‘ সর্বমোট ৩১১ টি সিট জিতে নিতে পারে , যার মধ্যে সরকারী দল লেবারের ২৩১ টি সিট তারা অর্জন করতে সক্ষম!
প্রত্যাশার বিপরীতে রয়েছে অপ্রাপ্তি, বিজয়ীর হাসিমুখ বনাম বিজিতের গ্লানি আর এই সূক্ষèাতিসূক্ষè হিসেবে ও রয়েছে এক ঘোর অনিশ্চয়তা, কারণ নতুন প্রজন্ম আর প্রতিমূর্হুতের পরিবর্তিত সময় জাতীয় নির্বাচনের আকাঙ্খিত সাল হতে পারে ‘২৮ -‘২৯। রাজনীতির হিসেবে সপ্তাহ যেখানে দীর্ঘ, সেখানে ৩-৪ বছর তো অনন্তকাল।
মেয়াদকাল মাত্র ১‘টি বছর শতকরা হিসেবে লেবারের জনপ্রিয়তা প্রায় ১৪.২ ভাগ কমে গেছে , যা ১৯৮২ সাল পরবর্তী জনপ্রিয়তায় সরকারের সর্ব্বোচ নিম্নগতি। তুলনামূলক বিচারে, ১৯৯২ সালে সাবেক সরকার প্রধান জন মেজরের কনজারভেটিভ পার্টি জনসমর্থন হারিয়েছিলেন শতকরা প্রায় ৯.৮ ভাগ মাত্র ১২ মাসে। অনিয়ম, দুর্নীতি আর তাল সামলাতে না পারা , মানুষের মন জয় সে তো দেবতার ও দু:সাধ্য।
জরিপ, সোশ্যাল মিডিয়া , সার্ভে যত বাহারি নামে ডাকি না কেন - যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় লেবার ও টোরি বহু বছরের পুরনো দলদু‘টির ভোট নজরকাড়া ভাবে কমে যাওয়া এবং তাদের দুর্গ বলে পরিচিত আসনগুলোতে ‘রিফর্মের‘ ভোট কারিগর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। ব্যতিক্রম রাজধানী লন্ডন, ওয়েলস , এসেক্স দূরবর্তী অঞ্চলগুলো নতুন সুরে মগ্ন ।কিয়ারের লেবার , টোরির বাগ্মী নেত্রী কিম কিংবা অন্য দলগুলোর পরিবর্তিত পলিসি -সন্দেহ নেই ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট ইমিগ্রেশন আইন বাতিল সহ নানা পরিবর্তন, পরিবর্ধনকারী ঘোষনা দেওয়া ব্যক্তি নাইজেলের ( পশ্চিমা শক্তির মদদপুষ্ট)আকর্ণ বিস্তৃত হাসি মাখা মুখটি প্রতি প্রত্যুষে দরজার সম্মুখে দন্ডায়মান দেখার অপেক্ষায় ।।(সূত্র: ব্রিটিশ গনমাধ্যম )
নুজহাত নূর সাদিয়া,
০৭ই অক্টোবর, ২৫ সাল ।
Leave Your Comments