প্রকাশিত :  ২০:৩২
০১ অক্টোবর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৫:৩৩
০২ অক্টোবর ২০২৫

অন্ধকারের শেষেই আলো

সম্পাদকীয় কলাম

অন্ধকারের শেষেই আলো

​অন্ধকার—শব্দটা শুনলেই কেমন যেন একটা গা ছমছমে ভাব আসে, তাই না? ছোটবেলায় তো রাত নামলেই বুক ধড়ফড় করত, একা হাঁটা তো দূরের কথা, ঘরেও একা থাকতে ভয় পেতাম। আর এখন? বড় হয়েও যেন মনের ভেতর একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করে। কারণটা খুব সোজা—অন্ধকার আমাদের চোখ ঢেকে দেয়। আমরা দেখতে পাই না, তাই ভয় পাই। কিন্তু সত্যিটা হলো, অন্ধকার মানেই সব শেষ নয়; এটা প্রকৃতির একটা অদ্ভুত সুন্দর রূপ, যেখানে চোখে হয়তো কিছুই ধরা পড়ে না, কিন্তু গভীরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সম্ভাবনা।

​জীবনেও তো এমন অন্ধকার আসে। ব্যর্থতা, বুকভাঙা কষ্ট, অসহ্য হতাশা—এগুলোই যেন মনের ভেতর আঁধার নামিয়ে দেয়। তখন মনে হয়, 'আর বোধহয় কিছু হবে না।' অথচ জানেন কি, এই অন্ধকারই হলো নতুন করে আলো দেখার প্রস্তুতি! দিনের বেলায় সূর্যের আলোর যে দাম, তা কি রাতের আঁধার ছাড়া বোঝা যেত? ঠিক তেমনি, জীবনের অন্ধকার না ছুঁলে সফলতার আলোটাও যেন ফিকে হয়ে যায়।

​আলো মানেই তো স্পষ্টতা, আলো মানেই দিকনির্দেশ। আলোয় হাঁটতে পারলেই আমরা পথ চিনি, তাই না? কিন্তু আলো শুধু বাইরের জগতকেই আলোকিত করে না, আলো আসলে আমাদের ভেতরের জগৎটাকেও জাগিয়ে তোলে।

​আমরা না জেনে অনেক সময় ভাবি—আলোটা বোধহয় অনেক দূরে, লুকিয়ে আছে। কিন্তু আসল সত্যটা হলো—আলোটা সবসময়ই আমাদের ভেতরেই থাকে। আমাদের ছোট্ট একটু সাহস, একটু আশা, একটা মজবুত বিশ্বাস—এগুলোই তো আসলে অন্তরের আলো। বাইরের ঝলমলে আলো কেবল সেই ভেতরের শক্তিকে উসকে দেয়।

​"শুধু দরকার সেই আলোর দিকে একবার এগিয়ে যাওয়ার সাহস।"

​দেখুন তো, এই একটা বাক্যের ভেতরেই কেমন পুরো জীবনের রহস্য লুকিয়ে আছে! আমরা অনেকেই জানি না যে, আমাদের একটা সামান্য পদক্ষেপই হয়তো ভয়ঙ্কর অন্ধকার থেকে বের করে আনবে। যে ছেলেটা বা মেয়েটা পরীক্ষায় ফেল করে দেয়, সে যদি নতুন করে আবার বই হাতে তোলে—ওটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া পদক্ষেপ। যে উদ্যোক্তা লোকসানের মুখে পড়েন, তিনি 'আর একবার চেষ্টা করব'—এই সিদ্ধান্তটা নিলেই একদিন সফলতার আলোয় পৌঁছতে পারেন।

​ইতিহাসে যত মানুষ আলো ছড়িয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কিন্তু একসময় ভয়ঙ্কর অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটেছেন।

​টমাস এডিসন—ভাবুন তো, তিনি হাজারবার ব্যর্থ না হলে আজ কি আমরা আলো পেতাম? যদি তিনি ভয় পেয়ে থেমে যেতেন, তাহলে পৃথিবীটা কেমন অন্ধকার থাকত!

​নেলসন ম্যান্ডেলা—২৭ বছর কারাগারের অন্ধকারে থেকেও তিনি হাল ছাড়েননি। সেই অন্ধকারই তো তাঁকে স্বাধীনতার আলো জ্বালাতে শিখিয়েছিল।

​রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ—তাঁদের অসাধারণ সাহিত্যগুলোও তো জীবনের গভীর অন্ধকারকে ছুঁয়েই এসেছে।

​তাই ইতিহাস বারবার প্রমাণ করে: অন্ধকারই মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

​অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, 'আমার জীবনে তো কোনো আলোই নেই।' এটা ভুল! আলো সবসময় আমাদের একদম কাছেই থাকে, আমাদের অন্তরের গভীরেও। যখন আমরা ভেঙে পড়ি, হাল ছেড়ে দিই, তখনই সেই ভেতরের আলোটা নিভে যায়। আর যখন আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস করি, তখন সেই আলো আরও ঝলমলে হয়ে ওঠে।

​যদি ভেতরের আলোটা জ্বালাতে চান, তবে এই জিনিসগুলো মনে রাখবেন:

১. ইতিবাচক চিন্তা করুন।

২. নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখুন।

৩. একটু ধৈর্য ধরতে শিখুন।

৪. যা পেয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন।

​অন্ধকার মানেই সবসময় খারাপ নয়। এটা আমাদের থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। রাতে ঘুমাই কেন? কারণ অন্ধকার থাকে। অন্ধকার না থাকলে তো ঘুম হতো না, বিশ্রাম হতো না। ঠিক তেমনি, জীবনের অন্ধকারও আমাদের নতুন শক্তি আর সতেজতা সঞ্চয় করতে শেখায়।

​জানেন তো, প্রত্যেকটা ব্যর্থতা আসলে একটা নতুন পথ দেখায়। যেন একটা দরজা বন্ধ হলো, আর পাশে আর একটা খুলে গেল। কিন্তু আমরা অনেকেই সেই বন্ধ দরজার সামনে বসে কাঁদতে থাকি, নতুন দরজাটার দিকে চোখ তুলে দেখি না। অথচ জীবন তো সবসময়ই সুযোগের আলো পাঠায়! শুধু দরকার সেই আলোটা দেখতে শেখা।

​আশা ছাড়া মানুষ তো মৃত মানুষের মতোই। আশা হলো সেই বীজ, যা অন্ধকারের মাটিতে পুঁতলে আলো ফুটে ওঠে। একজন কৃষক বীজ বোনার সাথে সাথেই ফসল পায় না; তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়। মাটি অন্ধকারে সেই বীজকে আগলে রাখে, তারপর একদিন সূর্যের আলোয় সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়। আমাদের জীবনের সব আশাও তেমনি অন্ধকার ভেদ করেই আলোর জন্ম দেয়।

অন্ধকার জয় করার সহজ কৌশল

​১. সমস্যাকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করুন—যেন এটা জীবনের একটা অংশ।

২. ছোট ছোট সাফল্যে মনোযোগ দিন—বড়টা একদিন এমনিতেই আসবে।

৩. নিজের ভুল থেকে শিখুন, একই ভুল বারবার করবেন না।

৪. অন্যকে আলো দেখাতে সাহায্য করুন—অন্যের আলোয় নিজের পথ আরও আলোকিত হবে।

৫. ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলুন—আপনি যতটা ভাবেন, তার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

​শুধু একজন মানুষের কথা নয়, একটা পুরো সমাজও কিন্তু অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ এক কঠিন অন্ধকারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মানুষ একসাথে দাঁড়িয়েছিল। তাদের ঐক্যের সাহসই সেই আলোকে বিজয়ী করেছিল। অর্থাৎ, আমরা একসাথে থাকলে কোনো অন্ধকারই টেকে না।

​হয়তো এই মুহূর্তে আপনিও কোনো এক অন্ধকারে আছেন। হয়তো জীবনে বড় কোনো ধাক্কা খেয়েছেন, হয়তো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। মন খারাপ করবেন না। মনে রাখবেন—আপনি একা নন। আপনার ভেতরেই আলোটা আছে। কেবল একবার সাহস করে আলোর দিকে এগিয়ে যান।

​অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, আলো সবসময় আমাদের খুব কাছেই থাকে। জীবন বারবার প্রমাণ করেছে—অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, আলোই শেষ কথা। সাহসী সেই মানুষরাই আলো খুঁজে পায়, যারা ভয়ে গুটিয়ে না গিয়ে একবার এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

​তাই মনের গভীরে গেঁথে রাখুন:

​“অন্ধকারের ভেতরেই নতুন আলোর জন্ম হয়।”


Leave Your Comments




সম্পাদকীয় এর আরও খবর