প্রকাশিত : ১৮:৫৪
২৯ আগষ্ট ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:২১
২৯ আগষ্ট ২০২৫
প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে থাকা ঢাকা শহরের ওপর যখন প্রথম ভোরের আলো এসে পড়ে, তখন ঘুম ভাঙে এক অসহায় জনপদের। কিন্তু এই ভোরে আশার আলো নেই, আছে এক বুকভরা অনিশ্চয়তা। একজন সাধারণ মানুষ যখন ঘুম থেকে উঠে, তখন তার মনজুড়ে থাকে নিত্যদিনের শঙ্কা—সে আজ কর্মস্থলে গিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারবে তো? তার সন্তানটি কি কোনো ছিনতাইকারী বা খুনীর হাতে পড়বে না? পত্রিকার পাতা খুললে বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে সেই শঙ্কা আরও গভীর হয়। সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের বাগ্বিতণ্ডা, অর্থনীতির ভগ্নদশা আর ক্রমবর্ধমান অপরাধের সচিত্র প্রতিবেদন। মনে প্রশ্ন জাগে, এই দেশ কি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা, নাকি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পথে অবিরাম ছুটে চলা এক জনপদ? এই প্রতিবেদনটি কেবল কিছু পরিসংখ্যান বা তথ্যের সমষ্টি নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সেই অন্তহীন অনিশ্চয়তা, সেই গভীর যন্ত্রণার একটি সাহিত্যিক দলিল। এটি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, যা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মনে ঘুরপাক খায়—আমরা যাব কোথায়? আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?
রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে বিপর্যস্ত গণতন্ত্র
দেশের রাজনীতি আজ এক জটিল ঘূর্ণাবর্তে আটকে আছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর গভীর মতবিরোধ। এই মতবিরোধ কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত পথে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজ নিজ কৌশলের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন পথের প্রস্তাব করছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থার বিতর্ক: তত্ত্বাবধায়ক বনাম আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব
একদিকে, প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে অনড়। তারা মনে করে, জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার একমাত্র পথ এটি । তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ ব্যবস্থা যা বিদায়ী সরকার ও নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে । এই স্বল্পস্থায়ী সরকার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ ছাড়া কোনো নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না, যাতে নির্বাচনের ফলাফলে এর কোনো প্রভাব না পড়ে । এই ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সমঝোতার অভাব থেকে, কারণ অতীতে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ ছিল এবং এরশাদ সরকারের আমলে জনগণের অবিশ্বাস চরমে পৌঁছেছিল ।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য কিছু বাম ও ছোট দল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation বা PR) পদ্ধতির পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে । এই নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল যে পরিমাণ ভোট পায়, সংসদের আসনগুলো সেই ভোটের আনুপাতিক হারে বন্টিত হয় । এই পদ্ধতি ছোট দলগুলোর জন্য সংসদে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায়, কারণ প্রচলিত ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) পদ্ধতিতে তারা খুব কমই আসন লাভ করতে পারে। কিন্তু তাদের এই দাবি সত্ত্বেও, বিএনপি এই পদ্ধতির প্রতি অনিচ্ছুক। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের মানুষ এই পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন নয় এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই ব্যবস্থা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে না ।
এই মতবিরোধের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর রাজনৈতিক কৌশল। জামায়াতের মতো ছোট দলগুলো জানে যে প্রচলিত পদ্ধতিতে তাদের বিজয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ, তাই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বই তাদের জন্য সংসদে প্রবেশ ও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার একমাত্র পথ। পক্ষান্তরে, বিএনপি একটি বড় দল হিসেবে মনে করে, একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রচলিত পদ্ধতিতেই তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় আসন ভাগাভাগি করতে বাধ্য হওয়ার যে সম্ভাবনা থাকে, তা তারা এড়িয়ে চলতে চায়। এটি কেবল আদর্শিক ভিন্নতা নয়, বরং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি মৌলিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এই অচলাবস্থা কেবল নির্বাচনকে ঘিরে নয়, এর গভীর প্রভাব দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে । রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সরাসরি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করে ।
নিরাপত্তার আকাল: এক অসহায় জনপদের চিত্র
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ এক গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সমাজের পচনশীল চিত্রের প্রতিফলন যেখানে আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা তার কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
ক্রমবর্ধমান অপরাধের পরিসংখ্যান ও জনমনে আতঙ্ক
সাম্প্রতিক সময়ে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং গণপিটুনির মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । পুলিশ সদর দফতরের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সারাদেশে খুনের ঘটনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯১টি বেশি হয়েছে এবং ডাকাতির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে । অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর ১০০ দিনেও পুলিশ পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারেনি, এবং এই সময়ে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে একটি করে খুন ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে । বেসরকারি সংস্থা আইন ও শালিস কেন্দ্রের হিসাব মতে, এই সময়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন ।
এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সংখ্যা নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনের গভীরে এক অজানা আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে । তারা প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন যে রাতে নিরাপদে ফিরতে পারবেন কিনা। ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, তার ছেলে কোচিং থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হাতে মার খেয়েছে, এবং তিনি এখন দিনের আলোতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আফসানা রহমান বলেন, মেয়েরা রাস্তায় বা বাসে হয়রানির শিকার হয় এবং প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদেরকেই দোষী বানানো হয় । ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জন্য দেহরক্ষী, বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও, সাধারণ মানুষ ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও পাচ্ছে না ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও নিরাপত্তাহীনতার শেকড়
এই গভীর নিরাপত্তাহীনতার মূলে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা। সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই নির্বিকার বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যার ফলে অপরাধীরা শাস্তির ভয় পাচ্ছে না এবং বেপরোয়া হয়ে উঠছে । এই অসহায়ত্ব কেবল অপারেশন্যাল সমস্যা নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল। বিগত সরকারের অধীনে প্রশাসন ও আদালতকে দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রের "চেইন অফ কমান্ড" ধ্বংস হয়েছিল, যা বিচারহীনতার একটি গভীর সংস্কৃতি তৈরি করেছে । যখন সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিতে শুরু করে, যার ফলে গণপিটুনির মতো ঘটনা বৃদ্ধি পায় । এটি একটি গভীর সামাজিক অবক্ষয়, যেখানে মৌলিক আইন ও শৃঙ্খলার ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস উঠে গেছে।
অর্থনীতির চোরাবালি: ব্যাংকিং খাতের সংকট
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অনিরাপত্তার পাশাপাশি, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি, ব্যাংকিং খাত, আজ এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতের ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
ভেতরের খবর: নাজুক ব্যাংকিং ব্যবস্থার হাল
দেশের ব্যাংকিং খাত রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ । বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৫,৬৩৩ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের ৮.১৬% থেকে বেড়ে ৯% হয়েছে । তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুনঃতফসিলকৃত এবং অবলোপিত ঋণ যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে । কিছু দুর্বল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মোট ঋণের ৭৭% পর্যন্ত পৌঁছেছে । বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাব ও তারল্য ঘাটতি চলছে ।
বিগত সরকারের নির্দেশে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে । এই ত্রুটিপূর্ণ উদ্যোগ জনগণের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাস তৈরি করে, যার ফলে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলার জন্য ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নগদ টাকা তুলতে না পেরে হতাশ গ্রাহকদের গালি শুনে একজন ব্যাংক ম্যানেজার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, যা আস্থার সংকটের চরম দৃষ্টান্ত ।
খেলাপি ঋণ: অর্থনীতির ক্যান্সার
এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফল নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্নীতির সরাসরি প্রতিফলন। গত ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে, যা প্রমাণ করে যে দীর্ঘকাল ধরে তথ্য গোপন করা হয়েছিল । শক্তিশালী রাজনৈতিক যোগসূত্রযুক্ত কিছু গ্রুপের ঋণ জালিয়াতিই এই সংকটের মূল কারণ । এই খেলাপি ঋণগুলো দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন গভর্নর নিয়োগ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং অর্থ পাচার ও আর্থিক জালিয়াতি তদন্তের জন্য টাস্কফোর্স গঠনের মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে । তবে এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধান করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রিজার্ভের প্রহেলিকা: সমৃদ্ধি যখন মরীচিকা
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের তথাকথিত বৃদ্ধি এবং তার বাস্তব প্রভাবের মধ্যেকার গভীর ফারাক বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেক বেদনাদায়ক দিক। একদিকে, সরকারি পরিসংখ্যানে রিজার্ভ বৃদ্ধির খবর শোনা যায়, অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ডলার সংকটের কারণে অস্তিত্ব সংকটে ভোগেন।
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উত্থান-পতন
রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এবং বিদেশি ঋণের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে । কিন্তু এই আপাত উন্নতির আড়ালে রয়েছে এক জটিল সত্য। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ দুটি পদ্ধতিতে হিসাব করে: গ্রস ও নিট । গ্রস হিসাবে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে দেওয়া অর্থ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে প্রদত্ত অর্থও অন্তর্ভুক্ত করা হয় । কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এসব অর্থ প্রকৃত রিজার্ভের অংশ নয় । তাই, গ্রস রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার হলেও, নিট রিজার্ভ তার চেয়ে অনেক কম এবং তা দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোও সম্ভব নয় ।
রিজার্ভের এই সংকট এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে, যার পেছনে কিছু ভুল নীতিগত সিদ্ধান্ত দায়ী । দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল, যা হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলকে উৎসাহিত করেছে । এর ফলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় কমে গেছে এবং বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গেছে । ব্যাংকগুলো আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ করতে না পেরে বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য হয়েছে, যার জন্য তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ।
কেন ফল পাচ্ছেন না সাধারণ ব্যবসায়ীরা?
রিজার্ভের আপাত উন্নতি সত্ত্বেও সাধারণ ব্যবসায়ীরা কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না, কারণ অর্থনীতির মূল কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত ত্রুটিগুলো এখনো বিদ্যমান । ডলার সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা ঋণপত্র বা এলসি খুলতে পারছেন না । এতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে । আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে । অর্থাৎ, রিজার্ভের তথাকথিত বৃদ্ধি একটি মরীচিকা মাত্র, কারণ নিট রিজার্ভ এখনো আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো যথেষ্ট নয় । রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে ।
পথ হারানো জনগণের ভবিষ্যৎ কোথায়?
এই প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছিল "সাধারণ জনগণ যাবে কোথায়?" এবং "বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ভবিষ্যৎ কোথায়?"—এই দুটি গভীর প্রশ্ন দিয়ে। আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি এবং অর্থনীতির ভঙ্গুরতা—এই সব সংকট একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে, এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে । সাধারণ মানুষ এই দুষ্টচক্রের কেন্দ্রে অসহায়ভাবে আটকা পড়েছে।
এই সংকট কেবল একটি বা দুটি সমস্যার ফল নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। জনগণ আজ শুধু ভোট বা মৌলিক অধিকারই হারায়নি, তারা তাদের বিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধও হারিয়েছে। রাষ্ট্র যেখানে জনগণের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কথা, সেখানে জনগণই আজ সবচেয়ে বেশি অসহায়। ক্ষমতাধরদের জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও, সাধারণ মানুষ দিনের আলোতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে ।
এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথ সহজ নয়। এর জন্য কেবল একটি নির্বাচন বা একটি অর্থনৈতিক প্যাকেজ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান, বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করা, এবং অর্থনৈতিক নীতিতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। যতক্ষণ না এই মৌলিক পরিবর্তনগুলো আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে অনিশ্চয়তা আর হতাশা বিরাজ করবে। এই পথ কঠিন, কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই।