প্রকাশিত :  ১৬:৪৯
১১ জুলাই ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:০৭
১১ জুলাই ২০২৫

লাশের ওপর নাচ এবং আমাদের নীরবতা: এই বাংলাদেশ কি আমাদের কাম্য ছিল?

✍️ সম্পাদকীয় কলাম

লাশের ওপর নাচ এবং আমাদের নীরবতা: এই বাংলাদেশ কি আমাদের কাম্য ছিল?

পুরান ঢাকার একটি গলি—যেখানে প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটার মতো চলে ব্যবসা-বাণিজ্য, খোলেন দোকান, ফিরেন মানুষ। সেই চিরচেনা সকাল হঠাৎ থমকে যায় একাধিক গুলির শব্দে। কেউ দৌড়ায় না, কেউ এগিয়ে আসে না। মুহূর্তেই একটি জীবন থেমে যায়; এক ব্যবসায়ীর রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। তিনি কোনো নেতা নন, কোনো অপরাধীও নন—তিনি ছিলেন আমাদেরই মতো একজন, যার একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল চাঁদা না দেওয়া।

গা শিউরে ওঠে, যখন আমরা জানতে পারি—খুনি শুধু গুলি করেই থেমে থাকেনি, সে মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে নেচেছে, আনন্দে উল্লাস করেছে—যেন এটি কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, এক বিজয়ের উৎসব! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও কেবল একটি ঘটনার প্রমাণ নয়, এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভয়াবহ রূপ উন্মোচন করে—যেখানে হত্যা এখন বিনোদন, আর উল্লাস হয়ে উঠেছে অপরাধের নতুন ভাষা।

আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

একজন নিরীহ মানুষ খুন হন। আমরা দেখে আঁতকে উঠি, দু-একটি ফেসবুক পোস্ট দিই, তারপর নিঃশব্দে সরে যাই। কারণ আমরা জানি—প্রতিবাদ করলে পরবর্তী লাশটি আমাদেরও হতে পারে। এই যে ভয়, এই যে নীরবতা—এটাই খুনিদের প্রধান শক্তি। তারা জানে, আমরা আর রুখে দাঁড়াই না; আমরা শুধুই দেখি।

আর এভাবেই একটি দেশ, একটি জাতি প্রতিদিন একটু একটু করে মরতে থাকে।

রাজনৈতিক ছায়ায় জন্ম নেয় মৃত্যু

যিনি খুন করেছেন, তিনি একজন রাজনৈতিক দলের নেতার ঘনিষ্ঠ। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। কারণ, তার আছে ‘প্রতিপত্তি’। এই প্রতিপত্তি আসে অস্ত্র থেকে, দলীয় পরিচয় থেকে এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে। আমরা এমন এক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছি, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ অপরাধ করেও রক্ষা পেতে পারে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনাটি চিন্তার বাইরে।” কিন্তু আমাদের প্রশ্ন—চিন্তার বাইরে, নাকি দায়িত্ববোধের বাইরে? আপনি যদি বিচার না চান, যদি প্রতিরোধ না করেন—তবে দায়ভার আপনারও।

এই বাংলাদেশ কি আমাদের চাওয়া ছিল?

মুক্তিযুদ্ধে যে স্বপ্ন ছিল—স্বাধীনতা, মানবিকতা ও সুবিচারের—আজ সেই স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়ে আছে পুরান ঢাকার কোনো গলির রক্তমাখা পিচে। মুক্তিযোদ্ধারা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে চাঁদা না দিলে গুলি খেতে হয়? যেখানে বিচার চাইলে রাজনীতি পথ আটকে দাঁড়ায়?

আমরা আজ এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ‘সত্য বলা’ মানে বিপদ ডেকে আনা, আর ‘না বলা’ মানে প্রাণ হাতে করে চলা। এ এক সমাজ, যেখানে বেঁচে থাকাটা শুধু জীবনধারণ নয়—এটি প্রতিদিনের আতঙ্কের আরেক নাম।

আমরা কি এমন সমাজে পরিণত হয়েছি?

একের পর এক ঘটনা ঘটে, কেউ মুখ খুলে না; কেউ বিচার চায় না, কেউ প্রতিবাদ করে না। মানবাধিকার কমিশন নীরব, রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চুপ, সুশীল সমাজ বিবৃতি দেয় না। মনে হয়, এক ভয়াবহ মঞ্চে চলছে নীরব হত্যার নাটক—আর আমরা সবাই সে নাটকের দর্শক, অসহায়, নিরুত্তর।

যেখানে খুনকে “দুই দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব” বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে মানুষ নয়—রাজনীতিই টিকে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, বাস্তবে প্রতিরোধ নেই

হ্যাঁ, আমরা ফেসবুকে লিখি—“এটা আর কতদিন?”, “বাংলাদেশে বাঁচা দায়!”—কিন্তু আমরা রাস্তায় নামি না, প্রতিবাদ করি না, সংগঠিত হই না। কারণ, আমরা ভয় পাই। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। লাশের সংখ্যা আমাদের আর নাড়া দেয় না। এই নিষ্ঠুর অভ্যস্ততাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়।

কে দায়ী?

এই ঘটনায় দায়ী কেবল খুনি নয়। দায়ী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, দায়ী পুলিশের ব্যর্থতা, দায়ী মানবাধিকার সংস্থার নীরবতা, দায়ী আমাদের প্রত্যেকের নিস্তব্ধতা। আমরা মুখ না খুলে খুনিকে আরও সাহসী করে তুলেছি।

তবুও, আমরা কি এখনো জেগে উঠতে পারি না?

আমরা কি এখনও পারি না এই ঘটনার বিরুদ্ধে একত্রে রুখে দাঁড়াতে? পারি না কি বলতে—‘আর না!’ যেন আর কোনো ব্যবসায়ী, শিক্ষক বা সাধারণ মানুষ এই পেশিশক্তির বুলেটের শিকার না হন?

কী করতে হবে?

 ১. দলীয় পরিচয় নয়—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 ২. স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রশাসনের সাহসী এবং কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

 ৩. চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

 ৪. প্রতিটি এলাকায় নাগরিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে—যেখানে সাধারণ মানুষ রুখে দাঁড়াবে।

 ৫. রাজনৈতিক দলগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে—তাদের আশ্রয়ে কেউ অপরাধ করলে দলকেও দায় নিতে হবে।

এই লজ্জা আমাদের—আমরা কি এর ভার নিতে প্রস্তুত?

পুরান ঢাকায় যে ব্যবসায়ী খুন হলেন, তিনি আমাদেরই এক ভাই, এক চাচা, এক বন্ধু হতে পারতেন। আমরা যদি আজও চুপ থাকি, তবে আগামীকাল সেই গুলি আমাদের পরিবারের বুক চিরে যাবে। আমরা যদি এখনো জেগে না উঠি, তবে এই দেশ আর আমাদের থাকবে না—থাকবে শুধুই শাসন, ভয় আর লাশের ওপর নৃত্য।

আজ সময় এসেছে—চোখে জল এনে দেওয়া সেই ভিডিওটিই যেন আমাদের শপথ করায়—এই বর্বরতা আর নয়, এই নীরবতা আর নয়।

বাংলাদেশ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়—এটি একটি প্রতিজ্ঞা।

বিচারহীনতা ভেঙে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা।

আসুন, আমরা সবাই সেই প্রতিজ্ঞায় আবার ফিরে যাই।


Leave Your Comments




সম্পাদকীয় এর আরও খবর