প্রকাশিত : ১৯:৪০
০৩ জুলাই ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ২১:২১
০৩ জুলাই ২০২৫
রাজনীতি আদর্শগতভাবে জনসেবার সর্বোচ্চ মাধ্যম। একসময় এই ধারণার মধ্যেই নিহিত ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্রের মূল্যবোধ এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ক্রমেই সেই আদর্শ থেকে সরে গিয়ে বিপরীত পথে অগ্রসর হচ্ছে। আজ রাজনীতি কেবল সেবার মাধ্যম নয়—এটি পরিণত হয়েছে এক শ্রেণির মানুষের লোভ পূরণের হাতিয়ারে।
অনেক রাজনীতিবিদের কাছে ক্ষমতা এখন ব্যক্তিগত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতায় আসীন হলেই অর্থ, প্রভাব, পদমর্যাদা ও নানাবিধ সুযোগ মিলবে—এ কথা এখন আর গোপন নয়। বরং গর্বের সঙ্গে বলা হয়, "রাজনীতি করতে হলে খরচ করতে হয়"—আর এই খরচের বিনিময়ে প্রত্যাশা থাকে ক্ষমতায় গিয়ে তা বহুগুণে আদায় করার।
এই লোভের সংস্কৃতি রাজনীতিকে পরিণত করেছে এক প্রতিযোগিতার ময়দানে, যেখানে জনসেবা নয়, বরং প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই মুখ্য লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, যারা একসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তারাই ক্ষমতায় এসে সেই অপকর্মের অংশীদার হয়ে পড়েন।
ক্ষমতার প্রতি এই অতিমাত্রিক লোভের একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। মানুষের স্বভাবেই আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা থাকে। কিন্তু রাজনীতিতে যখন এই প্রবণতা আদর্শবোধকে অতিক্রম করে, তখন তা বিপজ্জনক রূপ নেয়। যখন রাজনীতিকেরা দেখেন যে ক্ষমতার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যন্ত হস্তক্ষেপ সম্ভব, তখন ক্ষমতা দায়িত্বের বদলে পরিণত হয় সম্পদ আহরণের এক অনিয়ন্ত্রিত মাধ্যম হিসেবে।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোতেও এই সমস্যার গভীর ছাপ পড়েছে। বহু দল এখন ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক। দল মানেই যেন এক নেতা, এক পরিবার, কিংবা একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এর ফলে দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং নেতৃত্বের ব্যক্তিস্বার্থই হয়ে ওঠে রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য।
এই পরিস্থিতি কেবল দলীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও এটি কলুষিত করে তুলছে। ক্ষমতাসীনরা প্রায়শই তাদের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার করেন। অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে ক্ষমতার রোটেশন ও জবাবদিহিতায়। যদি ক্ষমতা কিছু লোকের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে, তবে তা এক ধরনের "নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদ" এ পরিণত হয়।
রাজনীতিতে আগ্রহী তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও একটি অসুস্থ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—রাজনীতিকে তারা দেখছে ক্যারিয়ার গঠনের হাতিয়ার হিসেবে, যার লক্ষ্য বিলাসবহুল জীবন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতার প্রদর্শন। রাজনীতিবিদদের বিলাসী জীবনযাপন যেন তরুণদের মধ্যে এই মানসিকতা সৃষ্টি করছে। ফলে রাজনীতি আজ জনসেবার পরিবর্তে হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদী বিনিয়োগের একটি ক্ষেত্র।
উত্তরণের পথ কী?
প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। নেতৃত্বে পরিবর্তন, জবাবদিহিমূলক কাঠামো এবং তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মতামতের মূল্যায়ন ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তবে রাজনীতি আরও বেশি স্বার্থান্বেষী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠবে।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে হতে হবে আরও সক্রিয় ও সোচ্চার। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও সম্পদের পাচার সংক্রান্ত ঘটনা তুলে ধরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ—যেখানে ক্ষমতা নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণ হবে মূল চালিকাশক্তি। রাজনীতিবিদদের মধ্যে সরল জীবনযাপন, সততা ও জনসেবার প্রতিফলন ঘটলেই সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
রাজনীতি যদি তার প্রকৃত উদ্দেশ্যে ফিরে যেতে চায়—"আমি ক্ষমতায় যাচ্ছি দেশ গড়তে"—তবে এই বক্তব্য কেবল স্লোগান হিসেবে নয়, বাস্তব কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায়, এই লোভনির্ভর রাজনীতি শুধু রাজনৈতিক অবক্ষয়ই ডেকে আনবে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ধ্বংস করে ফেলবে।