প্রকাশিত : ১৩:৪৭
০৬ মে ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:২২
০৬ মে ২০২৫
রেজুয়ান আহম্মেদ, দুবাই থেকে: বিলাসবহুল শহর দুবাই—বিশ্ববাসীর কাছে এটি এক স্বপ্নের প্রতীক। এখানে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সোনায় মোড়া শপিং মল, উন্নত জীবনযাত্রা এবং ঝলমলে রাস্তাঘাটের সমারোহ। কিন্তু এই নগরীর পেছনে হাজার হাজার শ্রমিকের ঘাম ও অশ্রু মিশে আছে, যা অনেকের চোখে পড়ে না। বিশেষ করে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন এখানে একেবারেই ভিন্ন। তারা এসেছিলেন উন্নত জীবনের আশায়, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা এতটাই নির্মম ও বেদনাদায়ক যে, কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যও যেন তার ধারে-কাছে আসে না।
দুবাইয়ের তালাল ফুড ডেলিভারিতে কর্মরত বাংলাদেশি যুবকদের দৈনিক কর্মঘণ্টা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন—প্রচণ্ড রোদের মধ্যে বাইকে চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে দীর্ঘ সময় খাবার পৌঁছে দিতে হয় তাদের। অথচ একই কোম্পানিতে ভারত, নেপাল বা ফিলিপাইনের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন না। বাংলাদেশিদের দিয়ে দ্বিগুণ সময় কাজ করানোর কারণ স্পষ্ট—তারা “না” বলতে সাহস পান না, এবং কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না।
এক বাংলাদেশি ডেলিভারি কর্মীর ভাষ্য: “সকাল ৯টায় কাজ শুরু করে রাত ১২টার পর বাসায় ফিরি। মাঝখানে কোনো বিশ্রাম নেই, ক্ষুধার্ত অবস্থায়ই বাইকে উঠতে হয়। তবুও মালিক সন্তুষ্ট নন। সামান্য দেরি হলেও বকাঝকা, এমনকি জরিমানা করে। ভারতীয় বা নেপালি কর্মীরা নিয়মিত ছুটি পান, কিন্তু আমরা ছুটি চাইলে চাকরি হারানোর ভয়ে কাঁপি।”
এই ভয়ই তাদের নিত্যসঙ্গী। অভিযোগ জানানোর কোনো পথ খোলা নেই। বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের কোনো প্রতিনিধি এসব শ্রমিকের কাছে আসেন না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতা হলেও দূতাবাস নির্বিকার থাকে। রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি শ্রমিক যেন এক একটি নামহীন, মূল্যহীন অস্তিত্ব।
বাংলাদেশি হাইকমিশনের ভূমিকা তাই প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে ভিআইপি প্রোগ্রাম, ফটোসেশন আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। অথচ এই শ্রমিকরাই কোটি কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। কিন্তু তাদের জন্য বাস্তবসম্মত কোনো উদ্যোগ বা সামান্য সহানুভূতিও দেখা যায় না।
এক প্রবীণ প্রবাসী আক্ষেপ করে বলেন: “দূতাবাসে বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। তারা আমাদের চোখের জল দেখে না, নেতাদের ফুলের মালা পরাতেই ব্যস্ত থাকে!”
শ্রমিকদের নেই নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত ছুটি বা চিকিৎসাসুবিধা। অসুস্থ হলে নিজ খরচে চিকিৎসা করাতে হয়; না পারলে কাজ হারানোর ভয়ে অসুস্থ শরীরেই কাজ করে যেতে হয়। এটি যেন এক অদৃশ্য যন্ত্রণার চাকা, যা সারাবছর ধরে ঘুরতেই থাকে।
এই কঠিন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রবাসীরা। কারণ, দেশে রয়েছেন বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু দেশের সরকার, প্রশাসন কিংবা গণমাধ্যম কি কখনও তাদের এই দুর্দশার খবর রাখে?
৬ মাস আগে দুবাই আসা এক যুবক বলেন: “ভাবছিলাম স্বপ্নপুরীতে এসেছি। এখন মনে হয়, আমি এক জীবন্ত রোবট—কাজ, কাজ আর কাজ। ঘুম বা আত্মসম্মান বলতে কিছুই নেই।”
এই চিত্র কেবল তালাল ফুড ডেলিভারির নয়। নির্মাণস্থল, ক্লিনিং সার্ভিস বা ড্রাইভিং কোম্পানিগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজমান। বাংলাদেশিদের দিয়ে কম বেতনে বেশি সময় কাজ করানো হয়। দেশে ফিরলে চাকরি না পাওয়ার ভয়েই তারা সবকিছু সহ্য করেন।
প্রতিদিন শত শত তরুণ এই যন্ত্রণা বেছে নিচ্ছেন, শুধুমাত্র পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোর দায়বোধ থেকে। কিন্তু যখন হাইকমিশন নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন তাদের জীবনে নেমে আসে চরম হতাশার অন্ধকার।
এটি কেবল একটি মানবিক সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলার নগ্ন প্রকাশ। হাইকমিশন যদি সক্রিয় থাকত, তাহলে নিয়োগকর্তারা শ্রম আইন লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত কাজ করাতে পারত না। বৈষম্য কিংবা বেতন কর্তনের মতো ঘটনা এত ব্যাপক হতো না।
এখনই সময় প্রশ্ন তোলার—যাদের রক্ত-ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্সে দেশ চলে, তাদের প্রতি এমন অবহেলা কেন? মিডিয়া কেন নীরব? রাষ্ট্রদূতরা কেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ?
আমরা যাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলি, তাদের কি সত্যিকারের সম্মান দিচ্ছি? দুবাইয়ের আলোকোজ্জ্বল আকাশের নিচে শ্রমিকেরা যখন ক্লান্তিতে ঢলে পড়েন, তখন হয়তো ফোনে মাকে মিথ্যে বলেন, “ভালো আছি।” কিন্তু সেই ‘ভালো’-এর পেছনে যে বেদনার গভীরতা, তা কেউ বুঝতে চায় না।
এই লেখার মাধ্যমে সমস্ত অদৃশ্য, অবহেলিত, সংগ্রামী বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। রাষ্ট্রের প্রতি আকুল আবেদন—হাইকমিশন যেন প্রটোকল ছেড়ে মাঠে নামে, শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায়। না হলে একদিন এই পরিশ্রমী সন্তানেরা দেশে ফিরে যাবেন মাথা নত করে, আর জাতি হারাবে তার সবচেয়ে নিঃস্বার্থ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যোদ্ধাদের।